সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিউক্লিয়ার বিপর্যয় ( পর্ব ২)

বাংলাদেশের রূপপূর পারমানবিক প্রকল্পের দ্বায়িত্ব পেয়েছে একটা রাশিয়ান একটি কোম্পানি। ইতিহাস থেকে জানা যায় সেই কোম্পানি নিজ দেশের একটা পাওয়ার প্লান্টেই বিরাট ঝামেলার সৃষ্টি করেছিল।সে কোম্পানি আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের পাওয়ার প্লান্টে কি রকম কাজ করবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ষাটের দশকে এই রূপপুরেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রিঅ্যাক্টরের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যুহ (containment building) ছাড়াই ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরীর পরিকল্পনা প্রস্তাব জমা দিয়েছিল রাশিয়া। নিরাপত্তা ব্যুহের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে তখনও দম্ভভরে বলেছিল, আমাদের রিঅ্যাক্টর ডিজাইনে কোন খুঁত নেই, তাই এর চারপাশে ব্যুহ তৈরীর প্রয়োজন নেই। অথচ এর কিছু কাল পরেই ১৯৮৬ সালে তাদের নিজেদের কেন্দ্রেই ঘটে চেরনোবিল দূর্ঘটনা যাতে নিরাপত্তা ব্যুহ না থাকার কারণে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে। (Matin, 2012)




এখন ১১ নাম্বার আপডেটেড প্রযুক্তি ব্যাবহার করে তৈরি করা হচ্ছে আমাদের পাওয়ার প্লান্ট।এর সহ্যক্ষমতা নিয়ে বলা হয়েছে এটা ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে! আবার এদিক দিয়ে দেখা যায় পাবনায় রূপপূরে কয়েক দশকের মধ্যে ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা আছে।এবং সেটা বেশ বড় ধরনের।

এরপর যে বিষয় নিয়ে আসা যায় সেটা হল বর্জ্য। বাংলাদেশ বলে এই বর্জ্য নিয়ে যাবে রাশিয়া সেটাও রাশিয়াতে! কিন্তু এই কোম্পানি আগেই বলে দিয়েছে এই বর্জ্য তারা বহন করবে না।বিশেষ শর্ত সাপেক্ষ্যে তারা রাজি হয়েছে যে যদি তাদেরকে এই বর্জ্য পরিশোধন ও তা নিয়ে যাওয়ার ফুল পেমেন্ট করা হয় তবে তারা সাহায্য করতে রাজি।সেটা কতটুকু হবে সেটাও দেখার বিষয়।আর পারমানবিক বর্জ্য যে কতটা ভয়াবহ সেটা তো আমরা চেরনোবিল এর ঘটনা থেকেই দেখতে পারি।

ম্যানেজমেন্ট সিস্টাম কিরকম হবে সেটাও দেখার বিষয়। একটা সুইচ অফ করে ইউক্রেনের চেরনোবিলে ৩৫ লাখ মানুষকে মারা যায় তাহলে বাংলাদেশ যে কতটা কি করবে সেদিক দিয়ে চিন্তা হয়।

যদি পারমানবিক প্লান্টের রিএকটরে একটা ক্ষুদ্র ছিদ্রও হয় তবে তা নাগাসিকির ২০ গুন বেশি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলতে পারবে। যে দেশে রডের বদলে বাশ ব্যাবহার করা হয় সেখানে এমন পুংখানু পুংখানু ভাবে সব কিছু লক্ষ রাখা আসলেই কঠিন।অনেক কঠিন!

চেরনোবিল ছাড়া যে আর কোথাও ভয়াবহ দুর্ঘটনা হয়নি তাও কিন্তু নয়।আমাদের এশিয়ান প্রতিবেশি জাপানে হয়ে গিয়েছিল এক ভয়ংকর ট্রাজিডি।কিন্তু জাপানিজ দের দক্ষতা ও সচেতনতা তাদের বিরাট ক্ষতির হাত থেকে বাচিয়েছিল।

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিধ্বংসী প্রকটতা ভয়ংকরভাবে ফুটে ওঠে ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দূর্ঘটনায়। এর ফলে জোর হাওয়া লাগে পারমাণবিক শক্তিকে ঘিরে চলতে থাকা বিতর্কের পালে। এরপর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং দূর্ঘটনা প্রতিরোধী বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলে এর বিস্তার অব্যাহত থাকে। কিন্তু পারমাণবিক দৈত্যকে যে বোতলবন্দী করা সম্ভব হয়নি তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা দূর্ঘটনায়। এরপর থেকেই পুরো বিশ্ব এটা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা শুরু করে। জার্মানী ২০২২ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়। এমনকি ফ্রান্সের মত পারমাণবিক সক্ষমতার দেশ; যেখানে ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় পরমাণু শক্তি হতে তারাও এর বিস্তার হতে সরে এসে ২০২০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি অন্বেষণের ঘোষণা দেয়। অথচ বর্তমান বিশ্বে ‘ব্যাকডেটেড’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পরমাণু বিদ্যুৎকে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকেরা আগ্রহ ভরে গ্রহণ করছেন উন্নয়নের সারথী হিসেবে। জ্বালানী স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য এটি আমদানী করার কথা বলা হলেও পারমাণবিক কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও ভারত কিংবা পাকিস্তানের নড়বড়ে অবস্থার কথা আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ভুলে থাকতে চাইছেন। তারা এও ভুলে থাকতে চাইছেন যে শুধুমাত্র উৎপাদন খরচ হিসেবে এটি সাশ্রয়ী হলেও বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সন্ত্রাসী হামলার ঝুকি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর ইনসুরেন্স খরচ মিলিয়ে এটি আর সাশ্রয়ী থাকে না।

এদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে বাস করে প্রায় ১২০০ জন। যে কোন পারমাণবিক দূর্ঘটনার প্রথম ধাক্কাতেই কয়েক হাজার মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অমূলক নয়। ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দূর্ঘটনার সময় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে স্থানীয় জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল মাত্র ৬৩ জন। দূর্ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রাইপাট নগরীকে ঘিরে আশেপাশের ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর্গত অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে প্রায় আড়াই লক্ষ বাসিন্দাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। সেই দূর্গত অঞ্চল আজও পরিত্যক্ত, জনমানবহীন। তেমন কোন দূর্ঘটনা যদি ঘটেই যায় তবে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব হবে ইউক্রেনের মত ২ লক্ষ উদ্ধারকর্মী নিযুক্ত করা? বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব হবে ৩০ লক্ষ মানুষকে স্থায়ীভাবে অন্যত্র পুনবাসন করা?

বলা হচ্ছে যে কোন ধরণের ঝুকি মোকাবেলায় ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি যখন ফুকুশিমা ট্রাজেডি ঠেকাতে পারে না তখনই আরো আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি বাজারে আসে আর ঠিক সে সময়ই ল্যাবরেটরীতে প্রস্তুত হতে থাকে চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি। প্রযুক্তির আধুনিকায়নে এটি খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যে প্রকল্পের ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে জাতিগত বিপর্যয় সে প্রকল্প নিয়ে বিলাসিতা করা কি আমাদের শোভা পায়?


কিছু কথাঃ এই সিরিজটা সম্পূর্নভাবে নিউক্লিয়ার ট্রাজেডি নিয়ে লেখা। তাই এই সিরিজে এর ক্ষতিকর দিকের কথাই উঠবে। আমরা জানি আধুনিক বিশ্ব গঠনের পেছনে নিউক্লিয়ার ফিশন পাওয়ারের গুরত্ব। তবে এই গুরত্ব অন্যদিনের জন্য তোলা রইল। এখানে যা আলোচনা করা হবে সেটা শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিপর্যয় নিয়ে এবং তা আমাদের দেশে বা প্রতিবেশি দেশে ঘটলে আমাদের কি হবে তা নিয়ে। আশা করি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। একটু সাবধানে পড়ার অনুরোধ রইল।


মন্তব্যসমূহ

  1. বি.দ্রঃঃ সিরিজটা সম্পূর্নভাবে নিউক্লিয়ার ট্রাজেডি নিয়ে লেখা। তাই এই সিরিজে এর ক্ষতিকর দিকের কথাই উঠবে। আমরা জানি আধুনিক বিশ্ব গঠনের পেছনে নিউক্লিয়ার ফিশন পাওয়ারের গুরত্ব। তবে এই গুরত্ব অন্যদিনের জন্য তোলা রইল। এখানে যা আলোচনা করা হবে সেটা শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিপর্যয় নিয়ে এবং তা আমাদের দেশে বা প্রতিবেশি দেশে ঘটলে আমাদের কি হবে তা নিয়ে। আশা করি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। একটু সাবধানে পড়ার অনুরোধ রইল।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইনফার্টিলিটি ( infertility ): কেন জীব তার প্রতিরূপ তৈরি করে রেখে যেতে পারে না? প্রতিরোধ ও করণীয় ।

  ইনফার্টিলিটি ( infertility ): কেন জীব তার প্রতিরূপ তৈরি করে রেখে যেতে পারে না? প্রতিরোধ ও করণীয় ।  সব প্রজাতিই তার বংশধর রেখে যেতে চায়। মানুষ যেমন সন্তানের জন্ম দেয়, তেমন অন্যান্য প্রজাতিও দেয়। তবে , অনেক সময় তারা সন্তান জন্মদিতে সক্ষম হয়না। কেন হয়না, কি কারণ , কি করা উচিত তা নিয়ে এই আর্টিকেলে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব। অর্থাৎ মানুষের ইনফার্টিলিটি নিয়ে বিস্তারিত থাকবে।  আমাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সন্তান জন্মদিতে পারছেন না বা সক্ষম না। ইংরেজিতে একে বলা হয় , infertility বাংলায় বন্ধ্যাত্বতা। আমাদের মধ্যেও এই রোগে আক্রান্ত অনেকেই আছেন। শুধু আমেরিকাতেই ১০ - ১৫ % ( ১৫-৪৪ বছরের)  দম্পত্বি বন্ধ্যা বা ইনফার্টাইল। বাংলাদেশে একেবারে সিরিয়াস ভাবে সেরকম কেস স্ট্যাডি না হলেও, অনেকগুলো রিসার্চ এ পাওয়া গেছে, বাংলাদেশের বন্ধ্যাত্বতার রেট ৬% এর মত। পাশের দেশে ৭.৭% এর মত। সংখ্যাটা বিশাল। তো ইনফার্টিলিটি আসলে কি? “ যদি টানা এক বছর frequent, unprotected sex করার পরেও যদি কোন কাপল প্রেগনেন্ট না হন , তবে সেই কাপলটি ইনফার্টাইল”  ইনফার্টিলিটি হতে পারে দুইজনের একজনের কারণে...

কল

-  ন্যাশনাল এমারজেন্সি সার্ভিস থেকে মাহমুদ বলছি। কিভাবে সাহায্য করতে পারি? - “ ...খুন” - দুঃখিত ম্যাডাম , আপনাকে ঠিকমত শুনতে পারিনি। আপনার সাহায্যের কারণটি আরেকবার বলবেন দয়া করে।  - খুন হয়েছে।  - দুঃখিত ম্যাডাম, আপনি কি একটি খুনের রিপোর্ট করতে চাচ্ছেন?  - হ্যা।  - আচ্ছা ম্যাডাম,  আপনি কোথায় আছেন ? আমরা সাহায্য পাঠাচ্ছি। জানি না।  - আপনি জানেন না আপনি কোথায় আছেন? - হ্যা।  - আপনার আশেপাশে কি কিছু লক্ষ্য করতে পারছেন? - হ্যা। অন্ধকার।  - ম্যাডাম আপনার আশেপাশে কেউ থাকলে তাকে একটু ফোনটা দিবেন দয়া করে।  - আমি একা আছি।  - ম্যাডাম, আপনার নাম কি? - মাহিরা । মাহিরা  আলম।   - তো মাহিরা, আপনি বলছিলেন একটা খুন হয়েছে। কিভাবে বুঝলেন?  - আমি মেরে ফেলেছি।  - আচ্ছা।  - হ্যালো?? - জি মাহিরা, আপনি একটু ফোনে আমাদের সাথে কানেক্টেড থাকুন। আমি আপনাকে এখন বেশ কিছু প্রশ্ন করব। ভেবে চিন্তে সেগুলোর উত্তর দিবেন।  - আচ্ছা। - কে খুন হয়েছে?  - মাহি। - মাহি কে আপনি চেনেন? - হ্যা। - কে হয় আপনার সম্পর্কে? - আমার হাসবেন্ড।  ...

Sea Navigation (তারা থেকে জি পি এস এর পথচলা)

  “If you want to learn to pray, go to sea.” —Portuguese proverb “...অথবা খুব বিশাল সমুদ্রের মাঝে, হারিয়ে যাওয়ার মত..." এভয়েড রাফার কষ্ট গানের এই লিরিক্স দিয়ে বোঝা যায়, কষ্ট আসলে সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার মত। 🙂 আপনার মনে কখনো প্রশ্ন জাগে না? যেখানে আমরা নিজেদের পাড়ার মধ্যেই হারিয়ে যাই, এই বিশাল সমুদ্র, মহাসমুদ্রে আমরা হারাই না কেন?  হারিয়েছিলাম একসময়। অনেক দক্ষ নাবিক, ক্রু, জাহাজ হারিয়েছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা এই সমস্যা সমাধানের পথ বের করে নিয়েছি। সেটা অবশ্যই এক দিনে হয়নি, কয়েক শতাব্দি লেগেছে! ন্যাভিগেশন ব্যতীত, আমরা খুব সম্ভবত  সমুদ্রের কাছে হারিয়ে যাব। ন্যাভিগেশন প্রাচীন প্রাথমিক সভ্যতার পক্ষে নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করা, বাণিজ্য রুট স্থাপন এবং বিশ্বের অন্য পাশের লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছিল। ন্যাভিগেশন মৎস্যজীবীদের বিদেশের সমুদ্র বন্দরে নিরাপদে যাত্রা করার জন্য ও তাদের বাড়ি এবং বাণিজ্য জাহাজগুলি খুঁজে পাওয়ার সুবিধা দেয়। আজ, ন্যাভিগেশন অনেক নিখুত ও সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ন্যাভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে জাহাজ, বিমান এবং ট্রাককে নির্দেশ দিয়ে বৈশ্বি...