সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিউক্লিয়ার বিপর্যয় (পর্ব 3)

১১ মার্চ ২০১১। দিন চলছে দিনের মতনই। ফুকুশিমার রিএক্টরর ও চলছে ভালোভাবেই। ৬ টা রিয়েক্টরের ৪ টা চলছে,বিদ্যুত তৈরি করছে।হাজারো ইঞ্জিনিয়ার আর লোক তাদের শিফটে কাজ করছেন।

মাসাও ইউশিডা। ফকুশিমা দাইইচি পাওয়ার প্লান্টের ম্যানেজার। দুপুরের লাঞ্চ শেষ, পাওয়ার প্লান্ট একবার চক্কর দিয়ে আসাও শেষ। সব প্লান মোতাবেক ঠিক ঠাক চলছে। সুপারভাইজার কে সব বুঝিয়েও দেয়া হয়েছে।তাহলে এখন একটু জিরিয়ে নেয়া যাক। সামনে থাকা বইটি নিয়ে পড়া শুরু করলেন।বেশ অনেকবছরের অভ্যাস এটি। বই না পড়লে তার ভালোই লাগে না।

সময় টা ঠিক মনে নেই। দুপুর ৩.১০-৩.১৫ এর মাঝামাঝি বা আশেপাশে। হটাৎ তার হাতের বইটা কাপতে শুরু করল। না বয়সের কারণে তার হাত কাপছে না। রিখটার স্কেলে 9 মাত্রার ভূমিকম্প। দিলেন দৌড়। তবে সতর্ক সংকেত চালু করতে ভুলে যান নি। সব লোক সাবধানতা অবলম্বন করল। কিছুক্ষন পর সব ঠিক। বের হয়ে আসলেন তিনি সুপারভাইজার দের নিয়ে জরুরী মিটিং ডাকলেন।সুপারভাইজাররা রিপোর্ট করে জানাল কোথাও কোন সমস্যা নেই তবে রিএক্টর ৬ এ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু ঐ রি এক্টর তো চালু নেই,তাই প্যারাও নেই। টোকিও পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউট কোম্পানীর কাছে একটা খবর পাঠিয়ে দিলেন। সুপারভাইজারদের কেও পাঠিয়ে দিলেন যার যার কর্মস্থলে। সিটে এসে বসলেন তবে তার মধ্যে শান্তি নেই।

হটাৎ সুনামি সতর্কতা জারি হল। ভয়ে কেপে উঠলেন ইউশিডা।সমুদ্রের পাশেই যে তার পাওয়ার প্লান্ট।তাৎক্ষনিক ভাবে জরুরি বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে সব পাওয়ার প্লান্ট রিএকটর বন্ধ করে দিতে বলা হল। কিন্তু বড্ড দেরি হয়েছে।নিউক্লিয়ার প্লান্ট অফ করতে যে সময়টা লাগে,প্রকৃতি সে সময়টা দেয়নি।

৩:৩৬। আধা ঘন্টার ও কম সময়ে সুনামি আঘাত হানল। যদিও বা অনেক লোককে বের করে নেয়া হয়েছে,২০০০ এর মত লোক থেকে গেল প্লান্টে।তারা জানেন,তারা পালালে আরেকটি চেরনোবিলের জন্ম হবে।

১৭ মিটার।কমপক্ষে ৬ তালার সমান উচু ঢেউ এসে আঘাত হানল জাপানে।প্রচুর ধ্বংসযোগ্য চালালো। নিজের পরিবারের খোজ নেয়ার কথা মাথায় এলেও তিনি আগে পাওয়ার প্লান্ট টার খোজ নিতে চাইলেন।
ডুবে গেছে পাওয়ার প্লান্ট।!! পানির নিচে! ম্যানেজারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ২০০০ জন কাজ করছিল,তারা কোথায়? পানিতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে! তার চাইতেও বড় কথা, এই স্থানে উদ্ধার কাজ চালাতে আসবে কে? এখানে আসা মানেই যে নির্ঘাত মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়া!




জাপানে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে সুনামিতে।আস্ত ট্রেন হারিয়ে গিয়েছে যাত্রীসহ! বহু ঘর বাড়ি ভেঙেছে। এর এইদিকে টোকিং পাওয়ার এর কর্মকর্তাগন ছুটছেন দেশকে বাচাতে। স্বেচ্ছাসেবক ডাকা হল। ওই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে যাওয়া মৃত্যুর মুখোমুখি। জাপান চায় না কাউকে জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে। তাই স্বেচ্ছাসেবক ডাকা হল। যদি কেউ দেশের জন্য স্বেচ্ছায় উদ্ধারকাজে অংশগ্রহন করতে চান তাহলে আসুন।জাপান আপনাদের মত বীর খুজছে। আমার বা আপনার মত বাঙালী হয়ে কেউ তখন ঘরের কোনায় লুকিয়ে থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়নি। বের হয়ে চলে গিয়েছে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহন করার জন্য।পরিবারের সদস্যরা সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছে। একজন ছেলে( নাম উল্লেখ করে বাকিদের খাটো করব না) তার বাবা ওই প্লান্টে কাজ করতেন। দুর্ঘটনায় পর থেকে তার খবর নেই। ছেলে বের হয়ে আসল দেশকে রক্ষার জন্য। মা আটকালে সে বলেছিল "কাপুরুষের মত বসে আমি থাকব না। আমার বাবার চাইতেও বেশি সাহস প্রদর্শন করে দেশের জন্য কাজ করব।বাবা তো এটাই চাইতেন মা।" মা হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

স্বেচ্ছাসেবক ডাকা হয়েছিল।আশা করা হয়েছিল ৭০০-৮০০ জন জুটবে।কিন্তু সবাইকে অবাক করে ২০০০ এর মত প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক জড়ো হয়েছিল।দেশকে রক্ষা করবে বলে।নারী পুরুষ বৃদ্ধ সবাই।কর্মকর্তারা অবাক হলেও তাদের কাজটুকু করেছেন। পি পি ই পড়ে উদ্ধার কাজ শুরু করা হল।পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।যদি রি এক্টর ঠান্ডা করা না যায় তাহলে ব্লাস্ট হবে।এরপর তাদের কিচ্ছু করার নাই।

লোকজন গেল তাদের দ্বায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করল।ঠান্ডা করল রি এক্টর।রোবোট পাঠানো হল। গলিত মৌলের উপস্থিতি দেখা গেল। সাথে সাথে আশাপাশের ১০০ কি.মি খালি করার নির্দেশ দেয়া হল।১ লাখ মানুষ সরে গেল।জায়গাটা টোকিও থেকে মাত্র ২৫০ কি.মি দূরে।কিছু হলে খুব ভয়াবহ হবে। কাজ করতে গিয়ে আহত ও নিহত হলেন ১০০০ জনের মত স্বেচ্ছাসেবী।জাপান হারালো তাদের অনেক ইঞ্জিনিয়ারকে।বাকি স্বেচ্ছাসেবীদের দেয়া হল জাপানের হিরো উপাধী। যদিও বা অনেকেই এই উপাধী গ্রহন করেনি।সেই ছেলেটির মা এক চিঠিতে জানিয়েছিল " আমার স্বামী ও ছেলে কোন জাতীয় নায়ক নয়।বরং তারা যা করেছে তা তাদের কর্তব্য ছিল।আমি সবাইকে আশা করব দেশের দুর্যোগের সময় এগিয়ে আসার জন্য।"

বিষয়টা অবাক করার মত না? আজ এই দুর্যোগের সময় আমরা একে অপরকে দোষ দিচ্ছি। আমরা জাপান সরকার,কানাডা সরকারের প্রশংসা করি।তবে নিজেদের না শুধরিয়েই শুধু আমাদের সরকার কে দোষারোপ করলেই কি সব হবে? আমরা কি কখনো পারব জাপানের লোকদের মত এতটা দেশপ্রেমী হতে? হয়তো পারব। সে দিনেরই আশা রইল।

কিছু কথাঃ এই সিরিজটা সম্পূর্নভাবে নিউক্লিয়ার ট্রাজেডি নিয়ে লেখা। তাই এই সিরিজে এর ক্ষতিকর দিকের কথাই উঠবে। আমরা জানি আধুনিক বিশ্ব গঠনের পেছনে নিউক্লিয়ার ফিশন পাওয়ারের গুরত্ব। তবে এই গুরত্ব অন্যদিনের জন্য তোলা রইল। এখানে যা আলোচনা করা হবে সেটা শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিপর্যয় নিয়ে এবং তা আমাদের দেশে বা প্রতিবেশি দেশে ঘটলে আমাদের কি হবে তা নিয়ে। আশা করি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। একটু সাবধানে পড়ার অনুরোধ রইল।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইনফার্টিলিটি ( infertility ): কেন জীব তার প্রতিরূপ তৈরি করে রেখে যেতে পারে না? প্রতিরোধ ও করণীয় ।

  ইনফার্টিলিটি ( infertility ): কেন জীব তার প্রতিরূপ তৈরি করে রেখে যেতে পারে না? প্রতিরোধ ও করণীয় ।  সব প্রজাতিই তার বংশধর রেখে যেতে চায়। মানুষ যেমন সন্তানের জন্ম দেয়, তেমন অন্যান্য প্রজাতিও দেয়। তবে , অনেক সময় তারা সন্তান জন্মদিতে সক্ষম হয়না। কেন হয়না, কি কারণ , কি করা উচিত তা নিয়ে এই আর্টিকেলে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব। অর্থাৎ মানুষের ইনফার্টিলিটি নিয়ে বিস্তারিত থাকবে।  আমাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সন্তান জন্মদিতে পারছেন না বা সক্ষম না। ইংরেজিতে একে বলা হয় , infertility বাংলায় বন্ধ্যাত্বতা। আমাদের মধ্যেও এই রোগে আক্রান্ত অনেকেই আছেন। শুধু আমেরিকাতেই ১০ - ১৫ % ( ১৫-৪৪ বছরের)  দম্পত্বি বন্ধ্যা বা ইনফার্টাইল। বাংলাদেশে একেবারে সিরিয়াস ভাবে সেরকম কেস স্ট্যাডি না হলেও, অনেকগুলো রিসার্চ এ পাওয়া গেছে, বাংলাদেশের বন্ধ্যাত্বতার রেট ৬% এর মত। পাশের দেশে ৭.৭% এর মত। সংখ্যাটা বিশাল। তো ইনফার্টিলিটি আসলে কি? “ যদি টানা এক বছর frequent, unprotected sex করার পরেও যদি কোন কাপল প্রেগনেন্ট না হন , তবে সেই কাপলটি ইনফার্টাইল”  ইনফার্টিলিটি হতে পারে দুইজনের একজনের কারণে...

কল

-  ন্যাশনাল এমারজেন্সি সার্ভিস থেকে মাহমুদ বলছি। কিভাবে সাহায্য করতে পারি? - “ ...খুন” - দুঃখিত ম্যাডাম , আপনাকে ঠিকমত শুনতে পারিনি। আপনার সাহায্যের কারণটি আরেকবার বলবেন দয়া করে।  - খুন হয়েছে।  - দুঃখিত ম্যাডাম, আপনি কি একটি খুনের রিপোর্ট করতে চাচ্ছেন?  - হ্যা।  - আচ্ছা ম্যাডাম,  আপনি কোথায় আছেন ? আমরা সাহায্য পাঠাচ্ছি। জানি না।  - আপনি জানেন না আপনি কোথায় আছেন? - হ্যা।  - আপনার আশেপাশে কি কিছু লক্ষ্য করতে পারছেন? - হ্যা। অন্ধকার।  - ম্যাডাম আপনার আশেপাশে কেউ থাকলে তাকে একটু ফোনটা দিবেন দয়া করে।  - আমি একা আছি।  - ম্যাডাম, আপনার নাম কি? - মাহিরা । মাহিরা  আলম।   - তো মাহিরা, আপনি বলছিলেন একটা খুন হয়েছে। কিভাবে বুঝলেন?  - আমি মেরে ফেলেছি।  - আচ্ছা।  - হ্যালো?? - জি মাহিরা, আপনি একটু ফোনে আমাদের সাথে কানেক্টেড থাকুন। আমি আপনাকে এখন বেশ কিছু প্রশ্ন করব। ভেবে চিন্তে সেগুলোর উত্তর দিবেন।  - আচ্ছা। - কে খুন হয়েছে?  - মাহি। - মাহি কে আপনি চেনেন? - হ্যা। - কে হয় আপনার সম্পর্কে? - আমার হাসবেন্ড।  ...

Sea Navigation (তারা থেকে জি পি এস এর পথচলা)

  “If you want to learn to pray, go to sea.” —Portuguese proverb “...অথবা খুব বিশাল সমুদ্রের মাঝে, হারিয়ে যাওয়ার মত..." এভয়েড রাফার কষ্ট গানের এই লিরিক্স দিয়ে বোঝা যায়, কষ্ট আসলে সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার মত। 🙂 আপনার মনে কখনো প্রশ্ন জাগে না? যেখানে আমরা নিজেদের পাড়ার মধ্যেই হারিয়ে যাই, এই বিশাল সমুদ্র, মহাসমুদ্রে আমরা হারাই না কেন?  হারিয়েছিলাম একসময়। অনেক দক্ষ নাবিক, ক্রু, জাহাজ হারিয়েছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা এই সমস্যা সমাধানের পথ বের করে নিয়েছি। সেটা অবশ্যই এক দিনে হয়নি, কয়েক শতাব্দি লেগেছে! ন্যাভিগেশন ব্যতীত, আমরা খুব সম্ভবত  সমুদ্রের কাছে হারিয়ে যাব। ন্যাভিগেশন প্রাচীন প্রাথমিক সভ্যতার পক্ষে নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করা, বাণিজ্য রুট স্থাপন এবং বিশ্বের অন্য পাশের লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছিল। ন্যাভিগেশন মৎস্যজীবীদের বিদেশের সমুদ্র বন্দরে নিরাপদে যাত্রা করার জন্য ও তাদের বাড়ি এবং বাণিজ্য জাহাজগুলি খুঁজে পাওয়ার সুবিধা দেয়। আজ, ন্যাভিগেশন অনেক নিখুত ও সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ন্যাভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে জাহাজ, বিমান এবং ট্রাককে নির্দেশ দিয়ে বৈশ্বি...