সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিউক্লিয়ার বিপর্যয় (পর্ব ৪)

থ্রি মাইল আইল্যান্ড,হ্যারিসবার্গ, পেনসেলভেনিয়া,যুক্তরাষ্ট্র

"আমেরিকার নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রকল্প মারা গিয়েছে। এটা মারা গিয়েছে থ্রি মাইল আইল্যান্ডে।"

প্রতিটা নিউক্লিয়ার বিপর্যয়ের একটা কারণ থাকে। চেরেনোবিলের ঘটনার পেছনের কারণ ছিল এক্সপেরিমেন্ট। ফুকিশিমা ট্রাজিডির পেছনের কারণ ছিল সুনামি। থ্রি মাইল আইল্যান্ডের দুর্ঘটনার কারণ ছিল যান্ত্রিক ত্রুটি। যদিও বা চেরনোবিল ট্রাজিডির ৬ বছর আগেই হয়েছিল এ দুর্ঘটনা। ফুকুশিমা বা চেরেনবিল ট্রাজিডির থেকে এই দুর্ঘটনাতে অনেক কম ক্ষতি হয়েছিল। আমেরিকার মতে এই দুর্ঘটনায় কোন মানুষ মারা যায় নি। যদিও বা এ নিয়ে বিতর্ক আছে,তবুও আমরা রিপোর্ট এর তথ্যটাকেই সত্য বলে মনে করব। বিস্তারিত তথ্যের জন্য কমেন্টে রিপোর্ট টা রাখলাম,দেখে নিতে পারেন।

T.M.I বা থ্রি মাইল আইল্যান্ড চালু হয় ১৯৭৪ সালে। চালু হওয়ার পর হ্যারিসবার্গ,পেনসেলভিনিয়ার মানুষজন বিরোধিতা করেন।সঠিক বর্জ্য ব্যাবস্থাপনা না করায় এটা বন্ধ করার দাবি ওঠে। নকশা ত্রুটিপূর্ণ দাবি করে এ নিয়ে আন্দোলন ও শুরু হয়। তার মধ্যেই ঘটে যায় এ ট্রাজিডি।

২৮ মার্চ ১৯৭৯ সাল। বিকাল ৪ টা। T.M.I এর দুটো রি এক্টর ছিল। দুটো মিলে ১৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত সরবরাহ করত। বিকাল ৪ টার দিকে T.M.I 1 এর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয় রি ফুয়েলিং করার জন্য। তবে T.M.I 2 চালু ছিল। হটাৎ করেই রিএক্টরের কুলিং সিস্টেম অকেজো হয়ে যায়। পানি ঠান্ডা করার জন্য যে কুলিং পাম্প,সেটা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ৯ সেকেন্ডের ভেতরেই পানির তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়।রি এক্টরের ভেতরের প্রেশার ২২০০ PSI থেকে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

রেডিয়েশন বাতাসে ছড়াতে থাকে। পেনসেলভেনিয়ার গভার্নর আর নিউক্লিয়ার প্লান্টের ম্যানেজার দাবি করেন যে বাতাসে রেডিয়েশন ছড়ায়নি। তবে কিছু লোক আশেপাশের ৩ মাইল পর্যন্ত রেডিয়েশনের মাত্রা বিপদজনক মেপে দেখেছেন এবং তা গনমাধ্যমে প্রকাশ হয়। পেনসেলভেনিয়ার গভার্নর লকডাউন জারি করেন এবং ঘরের জানালা বন্ধ করে থাকতে বলেন।

দ্বিতীয় দিন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়। বিজ্ঞানীরা মেল্টডাউনের আশাঙ্কা করেছিলেন এবং সেটাই সত্য হয়। রেডিয়েশন বাড়তে থাকে।সেদিনই হ্যারিসবার্গের হাসপাতালে শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে বেশ কয়েকজন ভর্তি হওয়ায় আশেপাশের ১০ মাইল খালি করে দেয়া হয়। ১৪০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়।প্রথমে মহিলা ও শিশুদের,পর্যায়ক্রমে বাকিরা।

স্পেশাল টিম পাঠায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। তারা বেশ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে রেডিয়েশন কমানোর চেষ্টা করেন।আর এদিকে গরম রি এক্টরকে ঠান্ডাও করে ফেলেন। মেল্টডাউন যাতে ভয়াবহ না হয় সে পদক্ষেপ ও নেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজে এসে দুবার ঘুরে যান TMI পাওয়ার প্লান্ট। তিনি জনগনকে আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেন। ১২ দিন পর লকডাউন খুলে দেয়া হয়। সম্পূর্ন উদ্ধার অভিযান চালাতে ব্যায় হয় ৪০ মিলিয়ন ডলার! যা পেনসেলভেনিয়ার তৎকালিন ব্যায়ের ১০ ভাগের ১ ভাগ!রিপোর্ট অনুযায়ী থ্রি মাইল আইল্যান্ডের দুর্ঘটনায় কোন মানুষ মারা যায়নি। এমনকি কেউ আহত ও হননি।




থ্রি মাইল আইল্যান্ডের এ ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে নিউক্লিয়ার প্লান্ট প্রত্যাহারের দাবি ওঠে। যে আমেরিকাই প্রথমে নিউক্লিয়ার পাওয়ারকে নিরাপদতম বলে মনে করেছিল,তারাই ঘোষণা দেয় পর্যায়ক্রমে তাদের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করার। দুর্ঘটনার ৩০ বছর পর থ্রি মাইল আইল্যান্ড গতবছর বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রান্সও এ বছর তাদের ২৫ ভাগ নিউক্লিয়ার পাওয়ার উৎপাদন কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

থ্রি মাইল আইল্যান্ড আমেরিকার তৎকালীন অন্যতম সিকিউর প্লান্ট ছিল। ১৩ মাসের মাথায় রি এক্টর ২ এ এরূপ দুর্যোগ ঘটার পর সারা বিশ্বে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। এখন সেদিকেই বিশ্ব এগুচ্ছে। বারাক ওবামার নির্দেশে ৩০ বছর পর গত বছরের ৩০ শে সেপ্টেম্বর থ্রি মাইল আইল্যান্ড বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় আমারিকার নিউক্লিয়ার ইতিহাসের একটা কালো অধ্যায়।

কিছু কথাঃ এই সিরিজটা সম্পূর্নভাবে নিউক্লিয়ার ট্রাজেডি নিয়ে লেখা। তাই এই সিরিজে এর ক্ষতিকর দিকের কথাই উঠবে। আমরা জানি আধুনিক বিশ্ব গঠনের পেছনে নিউক্লিয়ার ফিশন পাওয়ারের গুরত্ব। তবে এই গুরত্ব অন্যদিনের জন্য তোলা রইল। এখানে যা আলোচনা করা হবে সেটা শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিপর্যয় নিয়ে এবং তা আমাদের দেশে বা প্রতিবেশি দেশে ঘটলে আমাদের কি হবে তা নিয়ে। আশা করি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। একটু সাবধানে পড়ার অনুরোধ রইল।


এ আর্টিকেল টা IEBA এর রিপোর্ট অনুসরণ করে লেখা হয়েছে। কমেন্টে রিপোর্ট টা দিচ্ছি। কোন প্রশ্ন থাকলে দেখে নিতে পারেন

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ইনফার্টিলিটি ( infertility ): কেন জীব তার প্রতিরূপ তৈরি করে রেখে যেতে পারে না? প্রতিরোধ ও করণীয় ।

  ইনফার্টিলিটি ( infertility ): কেন জীব তার প্রতিরূপ তৈরি করে রেখে যেতে পারে না? প্রতিরোধ ও করণীয় ।  সব প্রজাতিই তার বংশধর রেখে যেতে চায়। মানুষ যেমন সন্তানের জন্ম দেয়, তেমন অন্যান্য প্রজাতিও দেয়। তবে , অনেক সময় তারা সন্তান জন্মদিতে সক্ষম হয়না। কেন হয়না, কি কারণ , কি করা উচিত তা নিয়ে এই আর্টিকেলে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব। অর্থাৎ মানুষের ইনফার্টিলিটি নিয়ে বিস্তারিত থাকবে।  আমাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সন্তান জন্মদিতে পারছেন না বা সক্ষম না। ইংরেজিতে একে বলা হয় , infertility বাংলায় বন্ধ্যাত্বতা। আমাদের মধ্যেও এই রোগে আক্রান্ত অনেকেই আছেন। শুধু আমেরিকাতেই ১০ - ১৫ % ( ১৫-৪৪ বছরের)  দম্পত্বি বন্ধ্যা বা ইনফার্টাইল। বাংলাদেশে একেবারে সিরিয়াস ভাবে সেরকম কেস স্ট্যাডি না হলেও, অনেকগুলো রিসার্চ এ পাওয়া গেছে, বাংলাদেশের বন্ধ্যাত্বতার রেট ৬% এর মত। পাশের দেশে ৭.৭% এর মত। সংখ্যাটা বিশাল। তো ইনফার্টিলিটি আসলে কি? “ যদি টানা এক বছর frequent, unprotected sex করার পরেও যদি কোন কাপল প্রেগনেন্ট না হন , তবে সেই কাপলটি ইনফার্টাইল”  ইনফার্টিলিটি হতে পারে দুইজনের একজনের কারণে...

কল

-  ন্যাশনাল এমারজেন্সি সার্ভিস থেকে মাহমুদ বলছি। কিভাবে সাহায্য করতে পারি? - “ ...খুন” - দুঃখিত ম্যাডাম , আপনাকে ঠিকমত শুনতে পারিনি। আপনার সাহায্যের কারণটি আরেকবার বলবেন দয়া করে।  - খুন হয়েছে।  - দুঃখিত ম্যাডাম, আপনি কি একটি খুনের রিপোর্ট করতে চাচ্ছেন?  - হ্যা।  - আচ্ছা ম্যাডাম,  আপনি কোথায় আছেন ? আমরা সাহায্য পাঠাচ্ছি। জানি না।  - আপনি জানেন না আপনি কোথায় আছেন? - হ্যা।  - আপনার আশেপাশে কি কিছু লক্ষ্য করতে পারছেন? - হ্যা। অন্ধকার।  - ম্যাডাম আপনার আশেপাশে কেউ থাকলে তাকে একটু ফোনটা দিবেন দয়া করে।  - আমি একা আছি।  - ম্যাডাম, আপনার নাম কি? - মাহিরা । মাহিরা  আলম।   - তো মাহিরা, আপনি বলছিলেন একটা খুন হয়েছে। কিভাবে বুঝলেন?  - আমি মেরে ফেলেছি।  - আচ্ছা।  - হ্যালো?? - জি মাহিরা, আপনি একটু ফোনে আমাদের সাথে কানেক্টেড থাকুন। আমি আপনাকে এখন বেশ কিছু প্রশ্ন করব। ভেবে চিন্তে সেগুলোর উত্তর দিবেন।  - আচ্ছা। - কে খুন হয়েছে?  - মাহি। - মাহি কে আপনি চেনেন? - হ্যা। - কে হয় আপনার সম্পর্কে? - আমার হাসবেন্ড।  ...

Sea Navigation (তারা থেকে জি পি এস এর পথচলা)

  “If you want to learn to pray, go to sea.” —Portuguese proverb “...অথবা খুব বিশাল সমুদ্রের মাঝে, হারিয়ে যাওয়ার মত..." এভয়েড রাফার কষ্ট গানের এই লিরিক্স দিয়ে বোঝা যায়, কষ্ট আসলে সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার মত। 🙂 আপনার মনে কখনো প্রশ্ন জাগে না? যেখানে আমরা নিজেদের পাড়ার মধ্যেই হারিয়ে যাই, এই বিশাল সমুদ্র, মহাসমুদ্রে আমরা হারাই না কেন?  হারিয়েছিলাম একসময়। অনেক দক্ষ নাবিক, ক্রু, জাহাজ হারিয়েছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা এই সমস্যা সমাধানের পথ বের করে নিয়েছি। সেটা অবশ্যই এক দিনে হয়নি, কয়েক শতাব্দি লেগেছে! ন্যাভিগেশন ব্যতীত, আমরা খুব সম্ভবত  সমুদ্রের কাছে হারিয়ে যাব। ন্যাভিগেশন প্রাচীন প্রাথমিক সভ্যতার পক্ষে নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করা, বাণিজ্য রুট স্থাপন এবং বিশ্বের অন্য পাশের লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছিল। ন্যাভিগেশন মৎস্যজীবীদের বিদেশের সমুদ্র বন্দরে নিরাপদে যাত্রা করার জন্য ও তাদের বাড়ি এবং বাণিজ্য জাহাজগুলি খুঁজে পাওয়ার সুবিধা দেয়। আজ, ন্যাভিগেশন অনেক নিখুত ও সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ন্যাভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে জাহাজ, বিমান এবং ট্রাককে নির্দেশ দিয়ে বৈশ্বি...